প্রিজম, রংধনু, মরীচিকা, অপটিক্যাল ফাইবার

প্রিজম, রংধনু, মরীচিকা, অপটিক্যাল ফাইবার

আজকে আমরা প্রিজম, রংধনু, মরুভূমির মরীচিকা আর ইন্টারনেট দুনিয়ার হিরো অপটিক্যাল ফাইবার নিয়ে জানব। খুব সহজ করে পয়েন্টগুলো নিচে দিলাম।

প্রিজম (Prism)

সহজ কথায়, কোনো স্বচ্ছ মাধ্যমের দুই পৃষ্ঠ যদি সমান্তরাল না হয়ে কোণাকুনি থাকে, তাকেই প্রিজম বলে। সাধারণত কাচ দিয়ে তিনকোনা বা ত্রিভুজ আকৃতির প্রিজম বানানো হয়।

নিউটনের পরীক্ষা ও ভুল ধারণা

একসময় মানুষ ভাবত প্রিজম বুঝি নিজে থেকেই আলোর রং তৈরি করে। কিন্তু বিজ্ঞানী নিউটন একটা দারুণ পরীক্ষা করলেন। তিনি একটা প্রিজম দিয়ে সাদা আলোকে সাত রঙে ভাগ করলেন। তারপর উল্টো করে রাখা আরেকটা প্রিজম দিয়ে সেই সাত রংকে আবার এক করে সাদা আলো বানালেন।

তিনি প্রমাণ করলেন: প্রিজম কোনো রং বানায় না, সাদা আলোর ভেতরেই এই সাতটা রং লুকিয়ে থাকে। প্রিজম শুধু তাদের আলাদা করে দেয়।

প্রিজম কীভাবে রং আলাদা করে?

প্রিজমের উপাদানের প্রতিসরাঙ্ক (μ) আলোর রঙের ওপর নির্ভর করে। লাল আলোর জন্য প্রতিসরাঙ্ক এক রকম, বেগুনি আলোর জন্য আরেক রকম। তাই সাদা আলো যখন প্রিজমে ঢোকে:

প্রিজমের ব্যবহার (আয়নার বিকল্প)

প্রিজম শুধু রংই আলাদা করে না, একে আয়নার মতোও ব্যবহার করা যায়। আলো যদি নির্দিষ্ট কোণে প্রিজমে পড়ে, তবে সেখানে পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন ঘটে। সাধারণ আয়নায় আলোর কিছুটা অপচয় হয়, কিন্তু প্রিজমে প্রায় ১০০% আলো প্রতিফলিত হয়। তাই ভালো মানের পেরিস্কোপ বা বাইনোকুলারে আয়নার বদলে প্রিজম ব্যবহার করা হয়।

রংধনু (Rainbow)

রংধনু হলো প্রকৃতির তৈরি বিশাল একটা প্রিজম শো। বৃষ্টির পর আকাশে যখন পানির কণা ভেসে বেড়ায়, তখন সূর্য উঁকি দিলেই রংধনু দেখা যায়।

কীভাবে হয়?

১. বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ছোট ছোট প্রিজমের মতো কাজ করে।
২. সূর্যের সাদা আলো বৃষ্টির ফোঁটায় ঢোকার সময় প্রথমে প্রতিসরিত হয়।
৩. এরপর ফোঁটার পেছনের দেয়ালে আলোটার পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন ঘটে।
৪. শেষে ফোঁটা থেকে বের হওয়ার সময় আবার প্রতিসরিত হয়ে সাত রঙে ভেঙে আমাদের চোখে আসে।

এখানে আলো ঘন মাধ্যম (পানি) থেকে হালকা মাধ্যমে (বায়ু) আসার চেষ্টা করে এবং আপতন কোণ সংকট কোণের চেয়ে বড় হয় বলেই পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন ঘটে।

মরীচিকা (Mirage)

মরুভূমিতে তৃষ্ণার্ত পথিক অনেক দূরে পানি দেখতে পায়, কিন্তু কাছে গিয়ে দেখে শুধুই বালু! এই চোখের ধোঁকাই হলো মরীচিকা।

কেন এমন হয়?

মরুভূমিতে বালি প্রচণ্ড গরম থাকে। তাই বালির ঠিক উপরের বাতাস খুব গরম (হালকা মাধ্যম) আর উপরের বাতাস তুলনামূলক ঠান্ডা (ঘন মাধ্যম) থাকে।

১. দূরের কোনো গাছ থেকে আলো যখন নিচের দিকে আসে, তখন আলো ঘন (ঠান্ডা বাতাস) থেকে হালকা (গরম বাতাস) মাধ্যমে প্রবেশ করে।
২. নিয়ম অনুযায়ী আলো অভিলম্ব থেকে দূরে সরতে থাকে।
৩. সরতে সরতে একসময় আপতন কোণ সংকট কোণের চেয়ে বড় হয়ে যায়।
৪. তখন আলো আর মাটিতে না গিয়ে পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের কারণে বেঁকে পথিকের চোখে যায়।
৫. পথিকের মনে হয় আলোটা মাটি থেকে বা পানি থেকে উঠে আসছে। তাই সে গাছের উল্টো প্রতিবিম্ব দেখে ভাবে সেখানে পানি আছে!

অপটিক্যাল ফাইবার (Optical Fiber)

এটা হলো কাচ বা প্লাস্টিকের তৈরি চুলের মতো চিকন একটা পাইপ, যার ভেতর দিয়ে আলো চলাচল করে। বর্তমান যুগে ইন্টারনেট স্পিডের রাজা হলো এই অপটিক্যাল ফাইবার।

গঠন:
এর দুটো অংশ থাকে:
১. কোর (Core): ভেতরের অংশ, যার প্রতিসরাঙ্ক বেশি (μ=1.5)।
২. ক্ল্যাড (Clad): বাইরের জ্যাকেট বা আবরণ, যার প্রতিসরাঙ্ক কম (μ=1.45)।

কাজ করার কৌশল:

আলো যখন কোরের ভেতর দিয়ে যায়, তখন সে বারবার ক্ল্যাডিং-এর দেয়ালে ধাক্কা খায়। যেহেতু আলো ঘন (কোর) থেকে হালকা (ক্ল্যাড) মাধ্যমের দিকে যায় এবং বিশেষ কোণে ফেলা হয়, তাই আলো বাইরে বের হতে পারে না। বারবার পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন হয়ে আলো পাইপের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় পৌঁছে যায়।

কেন এটা সেরা?
সাধারণ তারে বিদ্যুৎ গেলে গরম হয়ে শক্তি নষ্ট হয়। কিন্তু অপটিক্যাল ফাইবারে আলোর কোনো শক্তিই প্রায় নষ্ট হয় না (শোষণ খুবই কম)। দৃশ্যমান আলোর বদলে এখানে ইনফ্রারেড বা অবলাল রশ্মি ব্যবহার করা হয় যাতে সিগন্যাল অনেক দূর পর্যন্ত নিখুঁত থাকে।

অংক (কোর ও ক্ল্যাডের সংকট কোণ):

আমরা জানি, সংকট কোণের সময় প্রতিসরণ কোণ 90 হয়।
ধরি, কোরের প্রতিসরাঙ্ক μ1=1.5 এবং ক্ল্যাডের μ2=1.45
সূত্রের সাহায্যে পাই:

μ2×sin90=μ1×sinθc1.45×1=1.5×sinθcsinθc=1.451.5θc=sin1(0.966)θc75

অর্থাৎ, আলো যদি 75-এর চেয়ে বড় কোণে কোরের দেয়ালে ধাক্কা খায়, কেবল তখনই আলো বাইরে না গিয়ে পাইপের ভেতর দিয়ে ছুটতে থাকবে।

Powered by Forestry.md