তড়িৎ আবেশ ও তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্র

তড়িৎ আবেশ ও তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্র

আগের ক্লাসে আমরা চার্জের সাথে পরিচিত হয়েছি। আজকে আমরা শিখব কীভাবে ছলে-বলে-কৌশলে একটা সুখী সংসার ভাঙতে হয়...

মানে, কীভাবে একটা চার্জ নিরপেক্ষ (Uncharged) বস্তুকে স্পর্শ না করেই চার্জিত করা যায়! এই মজার ব্যাপারটাকে বলে তড়িৎ আবেশ (Electrostatic Induction)

তড়িৎ আবেশ কী? (স্পর্শ ছাড়া কারসাজি!) ✨

কোনো চার্জিত বস্তুকে স্পর্শ না করে শুধু তার কাছাকাছি এনে অন্য একটি বস্তুকে সাময়িকভাবে চার্জিত করার পদ্ধতিই হলো তড়িৎ আবেশ

মনে আছে চিরুনির কথা? চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ানোর পর সেটা চার্জিত হয়। কিন্তু কাগজের টুকরা তো চার্জিত না! তবুও কাগজ কেন আকর্ষিত হয়? এই রহস্যের সমাধানই হলো তড়িৎ আবেশ!

"সুখী সংসার" ভাঙার কৌশল! 💔

এই যে একটা চার্জিত বস্তুর প্রভাবে অন্য বস্তুর চার্জগুলো দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল, এটাই হলো আবেশের মূল খেলা!

কীভাবে একটি বস্তুকে স্থায়ীভাবে চার্জিত করব?

শুধু কাছে আনলে তো বস্তুটা সাময়িকভাবে চার্জিত হয়। সরিয়ে নিলে আবার আগের মতো হয়ে যায়। যদি স্থায়ীভাবে চার্জিত করতে চাও, তাহলে সুখী সংসারের এক সদস্যকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে হবে! 😉

ক) ধনাত্মক (+) চার্জে চার্জিত করা:

  1. ভিলেন আনো: প্রথমে একটা ঋণাত্মক চার্জযুক্ত বস্তু (যেমন: পশমে ঘষা ইবোনাইট দণ্ড) একটি অচার্জিত বস্তুর কাছে আনো। এতে অচার্জিত বস্তুর পজিটিভ চার্জগুলো কাছে আর নেগেটিভ চার্জগুলো দূরে চলে যাবে।
  2. পালাবার রাস্তা করে দাও: এখন বস্তুটার দূরের অংশটা মাটি বা তোমার শরীর দিয়ে স্পর্শ করো (একে বলে ভূ-সংযোগ)। পৃথিবী হলো চার্জের এক বিশাল ডাস্টবিন! বিকর্ষিত হওয়া নেগেটিভ চার্জগুলো (ইলেকট্রন) এই সুযোগে ওই রাস্তা দিয়ে পালিয়ে পৃথিবীতে চলে যাবে।
  3. রাস্তা বন্ধ করো: এবার আগে ভূ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করো, তারপর চার্জিত দণ্ডটি সরাও।
  4. কাজ শেষ! এখন ওই বস্তুর মধ্যে শুধু পজিটিভ চার্জগুলোই আটকা পড়ে থাকবে। আর এভাবেই বস্তুটা স্থায়ীভাবে ধনাত্মক চার্জে চার্জিত হয়ে গেল!

খ) ঋণাত্মক (-) চার্জে চার্জিত করা:

ঠিক তার উল্টো! এবার পজিটিভ চার্জগুলোকে তাড়াতে হবে।

  1. ভিলেন বদল: এবার একটা ধনাত্মক চার্জযুক্ত বস্তু (যেমন: রেশমি কাপড়ে ঘষা কাচদণ্ড) কাছে আনো। এতে অচার্জিত বস্তুর নেগেটিভ চার্জগুলো কাছে আর পজিটিভ চার্জগুলো দূরে চলে যাবে।
  2. সাহায্য চাও: এবার ভূ-সংযোগ করলে, পৃথিবী থেকে ইলেকট্রন (নেগেটিভ চার্জ) এসে দূরের ওই পজিটিভ চার্জগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে দেবে।
  3. রাস্তা বন্ধ করো: আগের মতোই, আগে ভূ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করো, তারপর চার্জিত দণ্ডটি সরাও।
  4. কাজ শেষ! এখন বস্তুর মধ্যে অতিরিক্ত ইলেকট্রনগুলো আটকা পড়ে গেল আর বস্তুটা স্থায়ীভাবে ঋণাত্মক চার্জে চার্জিত হয়ে গেল!

তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্র (Electroscope)

যে যন্ত্রের সাহায্যে চার্জের উপস্থিতি, প্রকৃতি এবং পরিমাণ পরিমাপ করা যায় তাকে তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্র বলে।

এটা এমন একটা যন্ত্র যা দিয়ে কোনো বস্তুতে চার্জ আছে কি না, বা কী ধরনের চার্জ আছে, তা বোঝা যায়।

image
image

এর কাজ কী?

১. চার্জের অস্তিত্ব নির্ণয়:

কোনো বস্তুকে চাকতিতে স্পর্শ করালে যদি সোনার পাত দুটো ফাঁক হয়ে যায়, তাহলে বুঝবে বস্তুটিতে চার্জ আছে। কারণ একই রকম চার্জ পাওয়ায় পাত দুটো একে অপরকে বিকর্ষণ করে।

২. চার্জের প্রকৃতি নির্ণয়:

৩. চার্জের পরিমাণ নির্ণয়:

পাতের ফাঁক যত বেশি হবে, বুঝবে চার্জের পরিমাণ তত বেশি। ফাঁক কম হলে চার্জের পরিমাণও কম।
image

কিছু কমন প্রশ্ন

🌞 কোন বস্তুতে আধান আছে কিনা তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে কীভাবে নিশ্চিত হবে?
উঃ একটি নিস্তড়িত তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্রের পাত দুটো পরস্পরের সাথে লেগে থাকে। কোনো আহিত বস্তুর সন্নিকটে এরূপ একটি নিস্তড়িত তড়িৎবীক্ষণ যন্ত্র আনলে চাকতিতে বিপরীত ধর্মী এবং পাতদ্বয়ের সমধর্মী আধান আবিষ্ট হওয়ার কারণে পাতদ্বয় পরস্পর ফাঁক হয়ে যায়। এতেই প্রমাণিত হয় যে পরীক্ষণীয় বস্তুতে আধান বিদ্যমান। পরীক্ষণীয় বস্তুতে কোনো আধান না থাকলে স্বর্ণের পাতদ্বয় পরস্পর ফাঁক হবে না, বরং মিল থাকবে।

🌞 “বিকর্ষণই তড়িৎ গ্রস্থতার নিশ্চিত প্রমাণ”। ব্যাখ্যা কর।
উঃ আমরা জানি, একটি চার্জিত বস্তু একটি অচার্জিত বস্তুকে আকর্ষণ করে এবং বিপরীত ধর্মী চার্জ পরস্পরকে আকর্ষণ কর। সুতরাং, আকর্ষণ দ্বারা আকর্ষণ দ্বারা বস্তুটি তড়িৎগ্রস্থ কিনা তা বোঝা যায় না। কিন্তু সমধর্মী চার্জ পরস্পরকে বিকর্ষণ করে। সুতরাং, বিকর্ষণই তড়িৎগ্রস্থতার নিশ্চিত প্রমাণ।

🌞 কার্পেটের উপর খেলার সময় বাচ্চাদের মাথার চুল খাড়া হয়ে যায় কেন?

উঃ ছোট শিশু হামাগুড়ি দিয়ে চলার সময় কার্পেটের সাথে তার পায়ের ঘর্ষণের ফলে স্থির বিদ্যুৎ অর্থাৎ চার্জ তৈরি হয় যা তার সারা গায়ে ছড়িয়ে পড়ে। তখন গায়ের লোম বা চুলগুলো একই আধানে আহিত হওয়ায় তারা পরষ্পরকে বিকর্ষণ করে যার ফলে খাড়া হয়ে যায়।

image

🌞বজ্রপাতের পেছনে স্থির তড়িতের অবদান কী?

মেঘের সাথে মেঘের ঘর্ষণের কারণে মেঘে বিপুল পরিমাণ চার্জ তৈরি হয় এবং মেঘের এক প্রান্তে ধ্বনাত্বক ও অন্যপ্রান্তে ঋণাত্বক চার্জ হয়ে চার্জ আলাদা হয়ে যায়। অর্থাৎ মেঘে দুই মেরুর সৃষ্টি হয়। ফলে মেঘের নিচে বা ভূমিতে বৈদ্যুতিক আবেশের কারণে চার্জের সৃষ্টি হয়। সেই চার্জ মেঘের এক প্রান্তের চার্জকে আকর্ষণ করে। মাঝে মাঝে আকর্ষণটা এতো বেশি হয় যে মেঘের এক প্রান্তের চার্জ যা ভূমিতে বা নিচে সৃষ্ট চার্জের প্রতি আকর্ষিত হয়ে বাতাস ভেদ করে নিচের চার্জের সাথে যুক্ত হয়ে যা আমরা বজ্রপাত হিসেবে দেখি।

image

One-Liner Recap

Powered by Forestry.md