চার্জ, চার্জের প্রকৃতি, তড়িতের প্রকারভেদ ও মাধ্যম
চার্জ, চার্জের প্রকৃতি, তড়িতের প্রকারভেদ ও মাধ্যম
চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে কাগজের টুকরোর কাছে ধরলে কী হয় দেখেছ তো? কাগজগুলো নাচের মতো লাফ দিয়ে চিরুনিতে আটকে যায়! এই জাদুটার পেছনেই আছে স্থির তড়িৎ।

আধান বা চার্জ কী?
পদার্থ সৃষ্টিকারী মৌলিক কণাসমূহের মৌলিক ও বৈশিষ্ট্যমূলক ধর্মকে আধান বা চার্জ বলে।
অন্যভাবে বলা যায়, যার উপস্থিতিতে কোন বস্তুতে স্থির বিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র, স্থির বিদ্যুৎ শক্তির সঞ্চার হয় ও যখন বস্তুটি কাগজের টুকরার মত ছোট ছোট হালকা টুকরা আকর্ষণ করার সামর্থ রাখে ও যার গতিতে বিদ্যুৎ প্রবাহ, বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র ও চৌম্বক ক্ষেত্রের উদ্ভব হয় তাকে চার্জ বলে।

স্থির তড়িৎ কী?
সোজা কথায়, যে চার্জ বা তড়িৎ এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকে, দৌড়াদৌড়ি করে না, সেটাই হলো স্থির তড়িৎ।
- উদাহরণ: শীতকালে উলের সোয়েটার খোলার সময় "চটপট" শব্দ হয়, কিংবা অন্ধকারে হালকা আলোর ঝলকানি দেখা যায়। এটাও স্থির তড়িৎ-এর খেলা!
তড়িতের গল্প: কীভাবে এর জন্ম হলো? (একটু ইতিহাস) 📜
অনেক অনেক দিন আগে (খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ সাল): থেলস নামের একজন গ্রিক দার্শনিক প্রথম দেখেন যে, অ্যাম্বার (পাইন গাছের শক্ত আঠা) রেশমি কাপড় দিয়ে ঘষলে তা ছোট ছোট জিনিসকে টাচ না করেই নিজের দিকে আকর্ষণ করে।

গ্রিক ভাষায় অ্যাম্বারকে বলা হতো "ইলেকট্রন"। সেখান থেকেই কিন্তু "ইলেকট্রিসিটি" বা তড়িৎ নামটা এসেছে!
অনেক দিন পর (১৬০০ সাল): ডা. গিলবার্ট দেখালেন যে, শুধু অ্যাম্বার না, কাচ, রাবার, গন্ধকের মতো আরও অনেক জিনিস ঘষলে এমন আকর্ষণ করার ক্ষমতা পায়।
তারপর আসল টুইস্ট: বিজ্ঞানীরা দেখলেন, সব চার্জ একরকম না। তারা দুই ধরনের চার্জ খুঁজে পেলেন। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন নামে এক বিজ্ঞানী এদের নাম দিলেন:
- পজিটিভ চার্জ (+)
- নেগেটিভ চার্জ (-)
চার্জের মূলমন্ত্র!
(এটা একদম মাথায় গেঁথে নাও)
চার্জের ধর্ম খুবই সিম্পল, অনেকটা চুম্বকের মতো:
সমধর্মী চার্জ একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় (বিকর্ষণ করে)। 🤜🤛 (যেমন: পজিটিভ-পজিটিভ বা নেগেটিভ-নেগেটিভ)
বিপরীতধর্মী চার্জ একে অপরকে কাছে টানে (আকর্ষণ করে)। 🥰 (যেমন: পজিটিভ-নেগেটিভ)
পরীক্ষা:
দুটো কাচদণ্ডকে রেশমি কাপড় দিয়ে ঘষে কাছাকাছি আনলে দেখবে ওরা দূরে সরে যাচ্ছে। কারণ দুটোতেই একই রকম (পজিটিভ) চার্জ তৈরি হয়েছে। আবার, একটা কাচদণ্ড (+) আর একটা ইবোনাইট দণ্ড (-) কাছে আনলে দেখবে একে অপরকে আকর্ষণ করছে!

চার্জ তৈরি হয় কীভাবে?
(একটু কেমিস্ট্রির ছোঁয়া!) ⚛️
ঘষাঘষির সময় আসলে কী হয়?
- সবকিছুই পরমাণু দিয়ে তৈরি। আর পরমাণুর ভেতরে থাকে পজিটিভ চার্জের প্রোটন আর নেগেটিভ চার্জের ইলেকট্রন।
- সাধারণত একটা পরমাণুতে প্রোটন আর ইলেকট্রনের সংখ্যা সমান থাকে, তাই বস্তুগুলো চার্জ নিরপেক্ষ হয়।
- যখন দুটো বস্তুকে ঘষা হয়, তখন এক বস্তু থেকে কিছু ইলেকট্রন অন্য বস্তুতে চলে যায়। মনে রাখবে, প্রোটন কিন্তু নড়াচড়া করে না, শুধু ইলেকট্রনই লাফ দিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারে!
- যে ইলেকট্রন হারায়: তার মধ্যে প্রোটন (পজিটিভ চার্জ) বেশি হয়ে যায়। তাই সে পজিটিভ (+) চার্জে চার্জিত হয়। (যেমন: কাচদণ্ড)
- যে ইলেকট্রন পায়: তার মধ্যে ইলেকট্রন (নেগেটিভ চার্জ) বেশি হয়ে যায়। তাই সে নেগেটিভ (-) চার্জে চার্জিত হয়। (যেমন: রেশমি কাপড়)
:::warning
💡 গুরুত্বপূর্ণ কথা: ঘর্ষণের ফলে সবসময় দুটো বিপরীত চার্জ তৈরি হয়। একটা বস্তু যতখানি পজিটিভ হয়, অন্যটা ঠিক ততখানিই নেগেটিভ হয়।
:::


তড়িৎ মাধ্যম: কারা চার্জ পরিবহন করে?
চার্জ কোন বস্তুর মধ্যে দিয়ে চলতে পারে বা পারে না, তার ওপর ভিত্তি করে মাধ্যম ৩ প্রকার:
পরিবাহী (Conductor): এরা হলো হাইওয়ের মতো, চার্জ এদের মধ্যে দিয়ে সাঁই সাঁই করে চলতে পারে।
- উদাহরণ: লোহা, তামা, রুপা, সোনা, মানুষের শরীর, মাটি ইত্যাদি।
অপরিবাহী বা অন্তরক (Insulator): এরা হলো দেয়ালের মতো, চার্জকে এক ফোঁটাও এগোতে দেয় না। চার্জ যেখানে তৈরি হয়, সেখানেই বসে থাকে।
- উদাহরণ: প্লাস্টিক, রাবার, কাচ, শুকনো কাঠ, কাগজ ইত্যাদি।
অর্ধপরিবাহী (Semiconductor): এরা একটু আজব। এদেরকে বলা যায় ট্রাফিক জ্যামওয়ালা রাস্তা। কিছু বিশেষ অবস্থায় এরা চার্জ পরিবহন করে, আবার কিছু অবস্থায় করে না।
- উদাহরণ: সিলিকন, জার্মেনিয়াম (এগুলো মোবাইল, কম্পিউটারের চিপ বানাতে কাজে লাগে)।
তড়িতের প্রকারভেদ ⚡
তড়িৎ প্রধানত দুই প্রকার:
- স্থির তড়িৎ (Static Electricity): যা আমরা এই অধ্যায়ে পড়ছি। যেখানে চার্জ এক জায়গায় স্থির থাকে।
- চল তড়িৎ (Current Electricity): যখন চার্জ পরিবাহীর মধ্য দিয়ে চলতে শুরু করে। যেমন আমাদের বাসার লাইট, ফ্যান যা দিয়ে চলে। এটা আমরা পরের অধ্যায়ে বিস্তারিত জানব।
কিছু কমন প্রশ্ন ও উত্তর
🌞 চুল আঁচড়ালে চিরুনী কাগজের টুকরোকে আকর্ষণ করে কিন্তু চুল আঁচড়ানোর আগে আকর্ষণ করে না কেন?
উঃ প্রত্যেক পদার্থ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরমাণু দ্বারা গঠিত। পরমাণুতে নিউক্লিয়াসের চারদিকে ঘূর্ণায়মান ইলেক্ট্রন থাকে নিউক্লিয়াস প্রোটন ও নিউট্রন থাকে। পরমাণুর প্রোটন ও নিউট্রন নিরপেক্ষ অবস্থায় সমান থাকে। প্রোটনের আধান ধনাত্মক ও ইলেক্ট্রনকে আধান ঋণাত্মক ধরা হয়। আর নিউট্রন আধান নিরপেক্ষ। তাই স্বাভাবিক অবস্থায় কোনো পদার্থের পরমাণুতে তড়িৎ ধর্ম প্রকাশ পায় না। চুল আঁচড়ালে চিরুণীর ইলেক্ট্রন ও প্রোটনের সংখ্যার তারতম্য দেখা দেয় ফলে এটি তড়িৎগ্রস্ত হয় এবং কাগজের টুকরোকে আকর্ষণ করে। কিন্তু চুল আঁচড়ানোর আগে চিরুনীটি তড়িৎ নিরপেক্ষ থাকে বলে এটি কাগজের টুকরাকে আকর্ষণ করে না।
🌞 ঘর্ষণে কেন বস্তু আহিত বা চার্জিত হয় বুঝিয়ে দাও।
উঃ কোনো বস্তুর সাথে আরেকটি বস্তুর ঘর্ষণ হলে বা সংস্পর্শে আনা হলে যে বস্তুর ইলেক্ট্রন আসক্তি বেশি তা অপর বস্তু হতে ইলেক্ট্রন সংগ্রহ করে ঋণাত্মক আধানে আহিত হয় এবং অপরটি ধনাত্মক আধানে আহিত হয়। এভাবে ঘর্ষণের ফলে কোনো বস্তু আহিত হয়।
🌞 কাঁচদন্ড রেশম কাপড় দ্বারা ঘষলে কাঁচদন্ড ধণাত্মক আধানে আহিত হয় কেন?
উঃ রেশমের ইলেক্ট্রন আসক্তি কাঁচের চেয়ে বেশি হওয়ায় কাচদণ্ডকে রেশম দ্বারা ঘষলে কাঁচদন্ড হতে ইলেক্ট্রন রেশমে চলে যায়। ফলে ইলেক্ট্রন হারিয়ে কাঁচদন্ডটি ধনাত্মক আধানে আহিত হয়।
🌞 ফ্লানেল বা উলের কাপড়ের সাথে ইবোনাইট দন্ড ঘষলে কোনটি কোন আধানে আহিত হয়? ব্যাখ্যা কর।
উঃ ফ্লানেল বা উলের কাপড়ের সাথে ইবোনাইট দন্ড ঘষলে ইবোনাইট দন্ড ঋণাত্মক আধানে আহিত হয় এবং ফ্লানেল কাপড় ধনাত্মক আধানে আহিত হয়। কারণ, ইবোনাইট দন্ডের ইলেক্ট্রন আসক্তি ফ্লানেলের বা উলের চেয়ে বেশি বলে, পরস্পরের সাথে ঘর্ষণের ফলে ফ্লানেলের কাপড় থেকে ইলেক্ট্রন ইবোনাইট দন্ডে চলে আসে। ইবোনাইট দন্ড ইলেক্ট্রন গ্রহণ করে ঋণাত্মক আধানে আহিত হয় এবং ফ্লানেল কাপড় ইলেক্ট্রন দান করে ধনাত্মক আধানে আহিত হয়।
One-Liner Recap
- চার্জ দুই প্রকার: পজিটিভ (+) ও নেগেটিভ (-)।
- একই রকম চার্জ বিকর্ষণ করে, ভিন্ন রকম চার্জ আকর্ষণ করে।
- ঘর্ষণের ফলে ইলেকট্রন আদান-প্রদান হওয়ায় চার্জ তৈরি হয়।
- যাদের মধ্যে দিয়ে চার্জ চলে তারা পরিবাহী, আর যাদের মধ্যে দিয়ে চলে না তারা অপরিবাহী।