রাসায়নিক বিক্রিয়া ও তাপশক্তি

রাসায়নিক বিক্রিয়ার সময় তাপের কী হয়? কিছু বিক্রিয়া ঘটলে দেখবে টেস্টটিউব গরম হয়ে যায়, আবার কিছু বিক্রিয়ায় ঠান্ডা হয়ে যায়। কেন এমন হয়? চলো, এই রহস্যটাই আজ ভেদ করি।

তাপের এই পরিবর্তনের উপর ভিত্তি করে রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো মূলত দুই প্রকারের হয়।

১. তাপোৎপাদী বিক্রিয়া (Exothermic Reaction) - "গরম" বিক্রিয়া

"তাপ" আর "উৎপাদী" - নামটা শুনলেই বোঝা যাচ্ছে, এই বিক্রিয়ায় তাপ উৎপন্ন হয় বা বেরিয়ে আসে।

সহজ ভাষায়: যে বিক্রিয়া ঘটলে শক্তি বা তাপ বের হয়ে আসে, তাকে তাপোৎপাদী বিক্রিয়া বলে। বিক্রিয়াটা যেখানে ঘটে, সেই জায়গাটা গরম হয়ে যায়।

উদাহরণ:

কেন এমন হয়?
একদম সহজ হিসাব! এই বিক্রিয়ায়, বিক্রিয়কের (যারা বিক্রিয়া করে) শক্তিটা উৎপাদের (যা তৈরি হয়) শক্তির চেয়ে বেশি থাকে। বাড়তি শক্তিটাই তাপ হিসেবে বেরিয়ে আসে।

:::info

শক্তি: বিক্রিয়ক > উৎপাদ
:::

গ্রাফ দিয়ে বুঝি:

ভাবো, একটা বল উঁচু জায়গা (বিক্রিয়ক) থেকে গড়িয়ে নিচু জায়গায় (উৎপাদ) পড়ছে। পড়ার সময় তো সে কিছু শক্তি হারাবেই, তাই না? এখানেও ঠিক তাই হয়।

চিহ্নটা মনে রাখো:
তাপোৎপাদী বিক্রিয়ার তাপের পরিবর্তনকে ΔH (ডেল্টা এইচ) দিয়ে প্রকাশ করা হয়। যেহেতু সিস্টেম থেকে তাপ বেরিয়ে যাচ্ছে (লস হচ্ছে), তাই এর মান হয় নেগেটিভ (-ve)

যেমন, মিথেন গ্যাস পোড়ালে:

CH4(g)+2O2(g)CO2(g)+2H2O(g)

এখানে, ΔH=890 kJ/mol

মাইনাস চিহ্ন দেখেই বুঝে যাবে এটা একটা তাপোৎপাদী বিক্রিয়া।

তবে ΔH ছাড়া লিখলে এটাকে প্লাস দিয়ে লিখতে হয়।

:::warning
💡 এখানে সক্রিয়ণ শক্তি হলো:
কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু করার জন্য বিক্রিয়ক অণুগুলোকে বাইরে থেকে সর্বনিম্ন যে পরিমাণ শক্তি দিতে হয়, সেটাই হলো সক্রিয়ণ শক্তি
:::

এটা অনেকটা বিক্রিয়ার "স্টার্ট বাটন" বা "এন্ট্রি ফি"-এর মতো। এই শক্তিটা না
দিলে বিক্রিয়াই শুরু হবে না, সেটা তাপোৎপাদী হোক বা তাপহারী।

অর্থাৎ বিক্রিয়া শুরু করার জন্য যে প্রাথমিক "পুশ" দরকার হয়, সেটাই সক্রিয়ণ শক্তি।

২. তাপহারী বিক্রিয়া (Endothermic Reaction) - "ঠান্ডা" বিক্রিয়া

"তাপ" আর "হারী" - মানে যে তাপ হরণ করে বা শুষে নেয়।

সহজ ভাষায়: যে বিক্রিয়া ঘটার জন্য পরিবেশ থেকে তাপ বা শক্তি শোষণ করতে হয়, তাকে তাপহারী বিক্রিয়া বলে। ফলে ওই জায়গাটা ঠান্ডা হয়ে যায়।

উদাহরণ:

কেন এমন হয়?
এখানে হিসাবটা উল্টো! বিক্রিয়কের শক্তি উৎপাদের শক্তির চেয়ে কম থাকে। তাই বাইরে থেকে তাপ বা শক্তি "ধার" করে এনে তাকে উৎপাদে পরিণত হতে হয়।

:::info

শক্তি: উৎপাদ > বিক্রিয়ক
:::

গ্রাফ দিয়ে বুঝি:

ভাবো, একটা বলকে নিচু জায়গা (বিক্রিয়ক) থেকে ঠেলে উঁচু জায়গায় (উৎপাদ) তুলতে হচ্ছে। তোমাকে তো বাইরে থেকে শক্তি দিতে হবে, তাই না? এখানেও ঠিক তাই হয়।

চিহ্নটা মনে রাখো:
তাপহারী বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে, সিস্টেম তাপ শোষণ করছে (লাভ করছে), তাই ΔH-এর মান হয় পজিটিভ (+ve)

যেমন, চুনাপাথরকে তাপ দিলে:

CaCO3(s)ΔCaO(s)+CO2(g)

এখানে, ΔH=+176.8 kJ/mol

প্লাস চিহ্ন দেখেই বুঝবে এটা একটা তাপহারী বিক্রিয়া।

তবে ΔH ছাড়া লিখলে এটাকে মাইনাস দিয়ে লিখতে হয়।


তাপ পরিবর্তনের হিসাব

একটা বিক্রিয়ায় ঠিক কতটুকু তাপ উৎপন্ন হবে বা শোষিত হবে, সেটা কি বের করা যায়? অবশ্যই যায়! আর এটা বের করার জন্য আমাদের দরকার "বন্ধন শক্তি"।

বন্ধন শক্তি কী?

আগের নোটে আমরা পড়েছিলাম, পরমাণুরা একে অপরের সাথে বন্ড বা বন্ধন দিয়ে যুক্ত থাকে।

এই প্রয়োজনীয় বা নির্গত শক্তিটাই হলো বন্ধন শক্তি

The Golden Formula:

যেকোনো বিক্রিয়ার মোট তাপ পরিবর্তন (ΔH) বের করার সূত্র হলো:

ΔH = (বিক্রিয়কগুলোর মোট বন্ধন শক্তি) - (উৎপাদগুলোর মোট বন্ধন শক্তি)

মানে, মোট কত টাকার শক্তি দিয়ে তুমি পুরনো বন্ডগুলো ভাঙলে, আর নতুন বন্ড বানিয়ে মোট কত টাকার শক্তি ফেরত পেলে, এই দুইয়ের বিয়োগফলই হলো ΔH

উদাহরণ

প্রশ্ন: CH3Cl+Cl2CH2Cl2+HCl বিক্রিয়ার ΔH হিসাব করো।
(প্রশ্নে বন্ধন শক্তির মান দেওয়া থাকবে, যেমন: CH=413,ClCl=244,CCl=326,HCl=431kJ/mol)

সমাধান:

ধাপ ১: বিক্রিয়কের দিকে কী কী বন্ধন ভাঙতে হবে, সেটা দেখি।
CH3Cl-এর একটা CH বন্ধন ভাঙতে হবে আর Cl2-এর একটা ClCl বন্ধন ভাঙতে হবে।

Bond-breaking Energy=1×(CH)+1×(ClCl)=(413+244)kJ/mol=657kJ/mol

ধাপ ২: উৎপাদের দিকে কী কী নতুন বন্ধন তৈরি হচ্ছে, সেটা দেখি।
CH2Cl2-তে একটা নতুন CCl বন্ধন তৈরি হচ্ছে আর HCl-এ একটা HCl বন্ধন তৈরি হচ্ছে।

Bond-formation Energy=1×(CCl)+1×(HCl)=(326+431)kJ/mol=757kJ/mol

ধাপ ৩: এবার সূত্র ব্যবহার করি

ΔH=(Breaking Energy)(Formation Energy)ΔH=(657757) kJ/molΔH=100 kJ/mol

ফলাফল:
যেহেতু উত্তরটা মাইনাস (ve) এসেছে, তার মানে এটা একটা তাপোৎপাদী (Exothermic) বিক্রিয়া। এই বিক্রিয়ায় 100 kJ/mol তাপ উৎপন্ন হবে।

Alternate Method

অনেক সময় আমার ছাত্রছাত্রীদের কোন বন্ড ভাংলো আর কোন বন্ড গড়লো সেটা বুঝতে সমস্যা হয়। তাই তাদের জন্য এই আরেকটা মেথড দিয়ে দিচ্ছি।

এ মেথড অনুযায়ী তুমি শুধু ভাঙা বন্ড আর নতুন তৈরী হওয়া বন্ডের দিকে না তাকিয়ে সবগুলো বন্ডের হিসেব করবে। এরপর আগের মত একইভাবে ΔH করবে।

উপরের উদাহরণটা এই মেথডে করলেঃ

বিক্রিয়কের মোট বন্ড শক্তি

CH3Cl=3×(CH)+1×(CCl)=3×413+326=1565kJ/molCl2=244 kJ/molTotal=1565+244=1809 kJ/mol

উৎপাদের মোট বন্ড শক্তি

CH2Cl2=2×(CH)+2×(CCl)=2×413+2×326=1478 kJ/molHCl=431 kJ/molTotal=1478+431=1909 kJ/mol

এখন

ΔH=18091909=100 kJ/mol
Powered by Forestry.md