বিভিন্ন প্রকার বল ও তাদের প্রকৃতি
বিভিন্ন প্রকার বল ও তাদের প্রকৃতি
১. টান বল (Tension Force, )
যখন কোনো দড়ি, সুতা, চেইন বা তারকে টেনে লম্বা করার চেষ্টা করা হয়, তখন এর ভেতরে কণাগুলোর মধ্যে যে প্রতিরোধমূলক বলের সৃষ্টি হয়, তাকেই টান বল বলে।
ধর্ম:
- টানজনিত বল: এটি সবসময় "টানা" (pulling) বল হিসেবে কাজ করে, কখনো "ঠেলা" (pushing) বল হিসেবে কাজ করে না। তুমি দড়ি দিয়ে কোনো কিছুকে টানতে পারবে, কিন্তু ঠেলতে পারবে না।
- অভিমুখ: টান বলের দিক সবসময় বস্তু থেকে দূরে, দড়ির সমান্তরালে বাইরের দিকে ক্রিয়া করে।
- অভ্যন্তরীণ বল: এটি দড়ির অভ্যন্তরীণ একটি বল, যা দড়ির এক অংশ অন্য অংশের উপর প্রয়োগ করে।
- ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জোড়া: দড়ি যদি একটি বস্তুকে
বলে টানে, তবে বস্তুটিও দড়িকে বলে বিপরীত দিকে টানে (নিউটনের তৃতীয় সূত্র)।
মনে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট:
- আদর্শ দড়ি: গণিতের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত দড়িকে "আদর্শ" ধরে নিই। এর অর্থ হলো:
- দড়ির ভর নগণ্য (massless)। এর ফলে দড়ির সকল বিন্দুতে টানের মান সমান থাকে।
- দড়িটি অপ্রসারণশীল (inextensible), অর্থাৎ টানের কারণে এর দৈর্ঘ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না।
- পুলির ক্ষেত্রে: যদি একটি আদর্শ (ভরহীন ও ঘর্ষণহীন) পুলির উপর দিয়ে একটি আদর্শ দড়ি যায়, তবে দড়ির উভয় অংশের টানের মান সমান থাকে।
- উদাহরণ: একটি সিলিং থেকে
ভরের বস্তু ঝোলানো থাকলে, বস্তুটি স্থির অবস্থায় থাকায় তার উপর নিট বল শূন্য। - দড়ির টান বল (
) উপরের দিকে। - বস্তুর ওজন (
) নিচের দিকে। - সুতরাং,
।
- দড়ির টান বল (
২. তলের প্রতিক্রিয়া বল বা অভিলম্বিক প্রতিক্রিয়া বল (Normal Force, )
যখন একটি বস্তু অন্য একটি তলের সংস্পর্শে থাকে, তখন তলটি বস্তুর উপর লম্বভাবে যে প্রতিরোধমূলক বল প্রয়োগ করে, তাকে তলের প্রতিক্রিয়া বল বা অভিলম্ব বল বলে। "Normal" শব্দটি এখানে "লম্ব" বা "Perpendicular" অর্থে ব্যবহৃত হয়।
ধর্ম:
- ঠেলাজনিত বল: এটি সবসময় একটি "ঠেলা" (pushing) বল। তলটি সর্বদা বস্তুকে তার থেকে দূরে ঠেলে দেয়।
- অভিমুখ: এর দিক সবসময় সংস্পর্শ তলের উপর লম্বভাবে (Perpendicular) বাইরের দিকে হয়। তলের সাপেক্ষে বস্তুর অবস্থান বা প্রযুক্ত বলের দিক যাই হোক না কেন, অভিলম্ব বলের দিক সর্বদা তলের সাথে ৯০° কোণে থাকে।

- স্ব-নিয়ন্ত্রক বল (Self-adjusting force): এর মান প্রয়োজনের ভিত্তিতে পরিবর্তিত হতে পারে। তুমি একটি টেবিলের উপর যত জোরে চাপ দেবে, টেবিলটিও তত বেশি প্রতিক্রিয়া বল দেবে (যতক্ষণ না টেবিলটি ভেঙে যায়)।
মনে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট:
- সবসময়
-এর সমান নয়: একটি সাধারণ ভুল ধারণা হলো, সবসময় বস্তুর ওজন -এর সমান। এটি শুধুমাত্র তখনই সত্য যখন বস্তুটি একটি আনুভূমিক তলে স্থির থাকে এবং এর উপর অন্য কোনো উল্লম্ব বল প্রযুক্ত না হয়। - উদাহরণ (কখন
): - হেলানো তলে (On an Inclined Plane):
কোণে আনত তলের উপর ভরের বস্তু থাকলে, ওজন খাড়া নিচের দিকে কাজ করে। এক্ষেত্রে, ।
- হেলানো তলে (On an Inclined Plane):

- লিফটের ক্ষেত্রে: লিফট যদি
ত্বরণে উপরে ওঠে, তখন । আর যদি ত্বরণে নিচে নামে, তখন । - অতিরিক্ত বল প্রয়োগে: আনুভূমিক টেবিলে থাকা বস্তুর উপর যদি ওপর থেকে নিচের দিকে
বল প্রয়োগ করা হয়, তখন ।
৩. ঘর্ষণ বল (Friction Force, )
যখন একটি বস্তু অন্য একটি বস্তুর সংস্পর্শে থেকে গতিশীল হয় বা গতিশীল হওয়ার চেষ্টা করে, তখন বস্তুদ্বয়ের সংস্পর্শ তলে গতির বিরুদ্ধে যে বলের সৃষ্টি হয়, তাকে ঘর্ষণ বল বলে।
ধর্ম:
- বাধা দানকারী বল: এটি সর্বদা আপেক্ষিক গতিকে (relative motion) বা গতির প্রচেষ্টাকে বাধা দেয়।
- অভিমুখ: এর দিক সর্বদা গতির বা গতির চেষ্টার বিপরীত দিকে এবং সংস্পর্শ তলের সমান্তরালে (Parallel) ক্রিয়া করে।
- নির্ভরশীলতা: ঘর্ষণ বল তলের প্রকৃতি এবং অভিলম্ব বলের (
) উপর নির্ভর করে।
ঘর্ষণ বল প্রধানত দুই প্রকার:
ক) স্থিতি ঘর্ষণ (Static Friction, )
যখন একটি বস্তুর উপর বল প্রয়োগ করার পরেও বস্তুটি স্থির থাকে, তখন যে ঘর্ষণ বল ক্রিয়া করে তাকে স্থিতি ঘর্ষণ বল বলে।
- স্ব-নিয়ন্ত্রক: এটিও একটি স্ব-নিয়ন্ত্রক বল। প্রযুক্ত বল যত বাড়ানো হয়, এর মানও তত বাড়তে থাকে, যতক্ষণ না বস্তুটি চলতে শুরু করে।
- সর্বোচ্চ মান: স্থিতি ঘর্ষণের একটি সর্বোচ্চ মান আছে, যাকে সীমাস্ত ঘর্ষণ (Limiting Friction) বলে।
যেখানেহলো স্থিতি ঘর্ষণ গুণাঙ্ক। - গাণিতিক রূপ:
খ) গতি ঘর্ষণ (Kinetic Friction, )
যখন একটি বস্তু অন্য একটি তলের উপর দিয়ে চলতে শুরু করে, তখন যে ঘর্ষণ বল ক্রিয়া করে তাকে গতি ঘর্ষণ বল বলে।
- ধ্রুব মানের বল: গতি ঘর্ষণের মান সাধারণত ধ্রুবক থাকে (বেগের উপর খুব সামান্য নির্ভরশীল)।
- গাণিতিক রূপ:
যেখানেহলো গতি ঘর্ষণ গুণাঙ্ক।
মনে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট:
- গুণাঙ্কের সম্পর্ক: সাধারণত, স্থিতি ঘর্ষণ গুণাঙ্ক গতি ঘর্ষণ গুণাঙ্কের চেয়ে বড় হয় (
)। একারণেই কোনো স্থির বস্তুকে গতিশীল করা, গতিশীল বস্তুকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেয়ে বেশি কঠিন। - অভিলম্ব বলের গুরুত্ব: ঘর্ষণ বল নির্ণয় করার জন্য আগে সঠিকভাবে অভিলম্ব বল (
) নির্ণয় করা আবশ্যক। হেলানো তল বা লিফটের ক্ষেত্রে -এর মান পরিবর্তিত হলে ঘর্ষণ বলের মানও পরিবর্তিত হবে। - ক্ষেত্রফলের উপর নির্ভরশীল নয়: ঘর্ষণ বল সংস্পর্শ তলের ক্ষেত্রফলের উপর নির্ভর করে না। একটি চওড়া টায়ার এবং একটি সরু টায়ারের ঘর্ষণ বল (অন্যান্য শর্ত একই থাকলে) সমান হবে।