নিউটনের গতিসূত্র (Newton’s Laws of Motion)

নিউটনের গতিসূত্র (Newton’s Laws of Motion)

নিউটনের প্রথম সূত্র (Newton's 1st Law)

নিউটনের প্রথম সূত্রটি হলো: "বাহ্যিক কোনো বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির থাকবে এবং গতিশীল বস্তু সুষম দ্রুতিতে সরলপথে চলতে থাকবে।"

নিউটনের প্রথম সূত্র থেকে আমরা যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে আমরা জানতে পারি তা হলঃ

জড়তা (Inertia) হলো কোনো বস্তু তার নিজের স্থির বা গতিশীল অবস্থা বজায় রাখার প্রবণতা।

আর যেহেতু ভর বৃদ্ধি-হ্রাসের সাথে জড়তাও বৃদ্ধি বা হ্রাস পায়, তাই বলা যায় জড়তা হচ্ছে ভরের পরিমাপ

:::spoiler স্থিতি জড়তা ও গতি জড়তার উদাহরণ

স্থিতি জড়তা ও গতি জড়তা উভয়েই ভরের উপর ডিপেন্ড করে।

স্থিতি জড়তা (Rest Inertia):

কোনো স্থির বস্তু চিরকাল স্থির থাকতে চাওয়ার যে প্রবণতা, তাকে স্থিতি জড়তা বলে। বাহ্যিক কোনো বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু তার অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে না। নিচে এর কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলো:

গতি জড়তা (Dynamic Inertia):

কোনো গতিশীল বস্তু চিরকাল তার গতি অবস্থা (সমবেগে সরলপথে) বজায় রাখতে চাওয়ার যে প্রবণতা, তাকে গতি জড়তা বলে। বাহ্যিক বল প্রয়োগ না করলে গতিশীল বস্তু তার গতির পরিবর্তন করতে পারে না। নিচে এর কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলো:

গাণিতিক ও ভেক্টর ব্যাখ্যা:

যদি কোনো বস্তুর উপর ক্রিয়াশীল সমস্ত বাহ্যিক বলের ভেক্টর যোগফল (লব্ধি বল) শূন্য হয়, তাহলে বস্তুটির ত্বরণ শূন্য হবে।

গাণিতিকভাবে, যদি লব্ধি বল Fnet=0 হয়, তাহলে ত্বরণ a=0 হবে।

আমরা জানি, ত্বরণ হলো সময়ের সাথে বেগের পরিবর্তনের হার। ডিফারেনশিয়াল ক্যালকুলাসের ভাষায়, ত্বরণ হলো বেগের ডেরিভেটিভ।

a=dvdt

যেখানে,

এখন, প্রথম সূত্র অনুযায়ী, যদি Fnet=0 হয়, তাহলে a=0 । সুতরাং, dvdt=0

এই সমীকরণটি সমাধান করলে আমরা পাই v=ধ্রুবক

এর অর্থ হলো, বস্তুর বেগ ভেক্টরটি একটি ধ্রুবক। যেহেতু বেগ একটি ভেক্টর রাশি, এর মান ও দিক উভয়ই আছে। তাই, v ধ্রুবক হওয়ার অর্থ হলো:

:::warning

  1. বস্তুর বেগের মান (দ্রুতি) অপরিবর্তিত থাকবে।
  2. বস্তুর গতির দিক অপরিবর্তিত থাকবে, অর্থাৎ বস্তুটি সরলরেখায় চলবে।

যদি বস্তুটি শুরুতে স্থির থাকে, তবে তার আদি বেগ v=0 , এবং যেহেতু বেগ ধ্রুবক, তাই বস্তুটি চিরকাল স্থির থাকবে।
:::

বল (Force)

নিউটনের প্রথম সূত্র থেকে আমরা বলের গুণগত সংজ্ঞা পাই। বল হলো সেই বাহ্যিক কারণ, যা কোনো বস্তুর জড় অবস্থার পরিবর্তন ঘটায় বা ঘটাতে চায়। অর্থাৎ, যা স্থির বস্তুকে গতিশীল করে বা করতে চায়, অথবা গতিশীল বস্তুর বেগের (মান বা দিক বা উভয়) পরিবর্তন ঘটায় বা ঘটাতে চায়, তাকেই বল বলে।

নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র (Newton’s 2nd Law)

নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রটি মূলত ভরবেগের পরিবর্তনের উপর ভিত্তি করে তৈরি। সূত্রটি হলো: "কোনো বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনের হার এর উপর প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক।"

ভরবেগ (Momentum)

কোনো গতিশীল বস্তুর ভর ও বেগের গুণফলকে তার ভরবেগ বলে। এটি বস্তুর গতির পরিমাণ নির্দেশ করে। ভরবেগ একটি ভেক্টর রাশি এবং এর দিক বেগের দিকের সাথে অভিন্ন হয়।

গাণিতিকভাবে, ভরবেগ p হলে:

p=mv

📌 যেখানে,

যদি Δt সময়ে কোনো বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তন Δp হয়, তাহলে নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রের সাহায্যে বলকে নিম্নোক্তভাবে প্রকাশ করা হয়:

Favg=ΔpΔt

📌 এখানে:

যদি বস্তুর ভর m স্থির থাকে এবং তার আদি বেগ u ও চূড়ান্ত বেগ v হয়, তাহলে

সুতরাং, ভরবেগের পরিবর্তন:

Δp=mvmu=m(vu)

এই মানটি গড় বলের সমীকরণে বসালে আমরা পাই:

Favg=m(vu)Δt

দ্বিতীয় সূত্রের ক্যালকুলাস রূপ এবং প্রথম সূত্রের প্রমাণ

গাণিতিকভাবে,

Fdpdt

সমানুপাতিক ধ্রুবকের মান 1 ধরলে,

F=dpdt

এই সমীকরণটি তাৎক্ষণিক বল (Instantaneous Force) নির্দেশ করে, অর্থাৎ কোনো একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে প্রযুক্ত বল। এবং এটি নিউটনের সূত্রের সবচেয়ে সাধারণ রূপ। এখান থেকে প্রথম সূত্রে ফিরে যাওয়া যায়।

যদি বাহ্যিক বল F=0 হয়, তাহলে: dpdt=0

এর মানে হলো, ভরবেগ p ধ্রুবক। যদি বস্তুর ভর m অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে mv ধ্রুবক, যার অর্থ v ধ্রুবক। এটিই নিউটনের প্রথম সূত্র।

ভর ও ভরের পরিবর্তন (Mass and Change in Mass)

সাধারণত, ইন্টারমিডিয়েট লেভেলের আলোচনায় বস্তুর ভরকে ধ্রুবক হিসেবে ধরা হয়। যদি ভর m ধ্রুবক হয়, তাহলে নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রকে লেখা যায়:

F=d(mv)dt=mdvdt

যেহেতু dvdt=a , তাই আমরা পাই:

F=ma

এটি নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রের সুপরিচিত রূপ।

তবে কিছু ক্ষেত্রে, যেমন—জ্বালানি নির্গতকারী রকেট, বস্তুর ভর সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে। এক্ষেত্রে m আর ধ্রুবক নয়, এটি সময়ের একটি ফাংশন m(t) । তখন ডিফারেনসিয়েশনের গুণন সূত্র (Product Rule) ব্যবহার করতে হয়:

F=d(mv)dt=mdvdt+vdmdt

এখানে,

ত্বরণ (Acceleration)

ত্বরণ হলো সময়ের সাথে কোনো বস্তুর বেগ পরিবর্তনের হার। এটি একটি ভেক্টর রাশি।

তাৎক্ষণিক ত্বরণ (Instantaneous Acceleration):

সময়ের ব্যবধান Δt যখন শূন্যের খুব কাছাকাছি, তখন গড় ত্বরণের সীমাস্থ মানকে (limit) তাৎক্ষণিক ত্বরণ বলে।

গাণিতিকভাবে,

a=limΔt0ΔvΔt=dvdt

যেখানে,

যেহেতু বেগ ভেক্টর, তাই এর মান (দ্রুতি) বা দিক অথবা উভয়ের পরিবর্তনেই ত্বরণের সৃষ্টি হয়।

নিউটনের প্রথম সূত্র অনুযায়ী, যদি কোনো বস্তুর উপর নিট বল শূন্য হয় (Fnet=0), তাহলে তার ত্বরণও শূন্য হবে(a=0), যার ফলে বস্তুটি তার গতির অবস্থা (স্থির বা সমবেগ) বজায় রাখবে। বল প্রযুক্ত হলেই কেবল ত্বরণের সৃষ্টি হয় এবং বস্তুর বেগের পরিবর্তন ঘটে।

অর্থাৎ যদি নিট বল শুন্য না হয়, তাহলে:

ΣF=maF1+F2+F3=ma

অর্থাৎ যতগুলো বলই কাজ করুক না কেন, ত্বরণ একটাই।

আবার F=ma সূত্র থেকে আমরা এটাও পাই,

a=Fm

অর্থাৎ ত্বরণ আর ভর পরস্পর ব্যস্তানুপাতিক। তাই m1<m2 হলে a1>a2

নিউটনের তৃতীয় সূত্র (Newton’s 3rd Law)

নিউটনের তৃতীয় সূত্রটি হলো: "প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।"

এর মানে হলো, প্রকৃতিতে বল কখনও একা কাজ করে না; বল সবসময় জোড়ায় জোড়ায় আসে। যখন একটি বস্তু (A) অন্য একটি বস্তুর (B) উপর বল প্রয়োগ করে, তখন দ্বিতীয় বস্তুটিও (B) প্রথম বস্তুর (A) উপর ঠিক একই মানের কিন্তু বিপরীতমুখী একটি বল প্রয়োগ করে।

এই দুটি বলকে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জোড়া (action-reaction pair) বলা হয়।

গাণিতিক ও ভেক্টর ব্যাখ্যা:

যদি বস্তু A বস্তু B-এর উপর FAB বল প্রয়োগ করে (ক্রিয়া), তাহলে বস্তু B বস্তু A-এর উপর FBA বল প্রয়োগ করবে (প্রতিক্রিয়া)। তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী:

FAB=FBA

:::info
👉🏽 এখানে:

তৃতীয় সূত্রের বৈশিষ্ট্য ও সাধারণ ভুল ধারণা

তৃতীয় সূত্রটি সহজ মনে হলেও এর কিছু সূক্ষ্ম বিষয় নিয়ে প্রায়ই ভুল ধারণা তৈরি হয়। নিচে সেগুলো পরিষ্কার করা হলো:

বৈশিষ্ট্য:

  1. বল দুটি ভিন্ন বস্তুর উপর কাজ করে: ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া বল দুটি কখনোই একই বস্তুর উপর প্রযুক্ত হয় না। একটি যদি A-এর উপর কাজ করে, অন্যটি B-এর উপর কাজ করবে।
  2. বল দুটি সমান মানের: বস্তু দুটির ভর, আকার বা অবস্থা যাই হোক না কেন, ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া বলের মান সর্বদা সমান হবে।
  3. বল দুটি বিপরীতমুখী: বল দুটি একটি সরলরেখা বরাবর পরস্পরের বিপরীতে কাজ করে।
  4. বল দুটি সমজাতীয়: ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া বল সবসময় একই প্রকৃতির হয়। যেমন—ক্রিয়া বলটি মহাকর্ষ বল হলে, প্রতিক্রিয়া বলটিও মহাকর্ষ বল হবে। দুটি ভিন্ন প্রকৃতির বল (যেমন: মহাকর্ষ ও চৌম্বক বল) কখনও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জোড়া হতে পারে না।

সাধারণ ভুল ধারণা এবং তার ব্যাখ্যা:

ভুল ধারণা ১: ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া বল সমান ও বিপরীত হলে, তারা একে অপরকে বাতিল করে দেয়। তাহলে তো কোনো বস্তুরই সরণ বা ত্বরণ হওয়ার কথা নয়।

সঠিক ব্যাখ্যা:

এটি সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা। ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া বল একে অপরকে বাতিল বা নাকচ করে না, কারণ তারা দুটি ভিন্ন বস্তুর উপর কাজ করে। একটি বস্তুর উপর প্রযুক্ত মোট বল (net force) হিসাব করার সময় শুধুমাত্র ঐ বস্তুর উপর প্রযুক্ত বলগুলোকেই বিবেচনা করা হয়।

image

উদাহরণ:
যখন একটি টেবিলের উপর একটি বই রাখা হয়, তখন বইটি টেবিলের উপর নিচের দিকে একটি বল ( FBookTable) প্রয়োগকরে(ক্রিয়া)তখন টেবিলও বইয়ের উপর একটি সমান ও বিপরীতমূখী একটি বল (FTableBook ) প্রয়োগ করে (প্রতিক্রিয়া)।

বইটি স্থির থাকে কারণ বইটির উপর প্রযুক্ত বলগুলো (ওজন নিচের দিকে এবং টেবিলের প্রতিক্রিয়া বল উপরের দিকে) একে অপরকে বাতিল করে। এখানে টেবিলের উপর প্রযুক্ত বল নিয়ে আমরা ভাবছি না। একইভাবে, টেবিল স্থির থাকে কারণ তার উপর প্রযুক্ত বলগুলো (বইয়ের বল নিচের দিকে এবং মেঝের বল উপরের দিকে) বাতিল হয়ে যায়। ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া ( FBookTable এবং FTableBook ) ভিন্ন ভিন্ন বস্তুর উপর কাজ করায় তারা একে অপরকে বাতিল করার প্রশ্নই আসে না।

ভুল ধারণা ২: ক্রিয়া আগে ঘটে এবং প্রতিক্রিয়া পরে ঘটে।

সঠিক ব্যাখ্যা:

"ক্রিয়া" এবং "প্রতিক্রিয়া" শব্দ দুটি কেবল সুবিধার্থে ব্যবহৃত হয়। বাস্তবে, এই বল দুটি একই সাথে ঘটে হয় এবং একই সাথে বিলুপ্ত হয়। কোনোটি আগে বা পরে ঘটে না। তুমি দেয়ালে ধাক্কা দেওয়ার মুহূর্তেই দেয়াল তোমাকে ধাক্কা দেয়।

ভুল ধারণা ৩: ভারী বস্তু হালকা বস্তুর উপর বেশি বল প্রয়োগ করে।

সঠিক ব্যাখ্যা:

তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী বলের মান সর্বদা সমান। তবে বলের প্রভাব (অর্থাৎ ত্বরণ) বস্তুর ভরের উপর নির্ভর করে। নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র ( F=ma ) থেকে আমরা পাই, a=F/m

উদাহরণ:
একটি আপেল যখন পৃথিবীর দিকে পড়ে, তখন পৃথিবী আপেলকে যে বলে আকর্ষণ করে (ক্রিয়া), আপেলও পৃথিবীকে ঠিক একই মানের বলে আকর্ষণ করে (প্রতিক্রিয়া)। কিন্তু পৃথিবীর ভর অনেক বেশি হওয়ায় তার ত্বরণ ( a=F/mEarth ) এতই নগণ্য যে আমরা তা অনুভব করি না। অন্যদিকে, আপেলের ভর অনেক কম হওয়ায় একই পরিমাণ বলের প্রভাবে এটি একটি লক্ষণীয় ত্বরণ নিয়ে পৃথিবীর দিকে পড়তে থাকে।

তৃতীয় সূত্রের সাথে মহাকর্ষ ও কুলম্বের সূত্রের সম্পর্ক

মহাকর্ষ এবং কুলম্বের সূত্র দুটি হলো মৌলিক বলের সূত্র, এবং উভয়ই নিউটনের তৃতীয় সূত্রকে পুরোপুরি মেনে চলে।

মহাকর্ষ সূত্র (Law of Universal Gravitation):

দুটি বস্তু, যাদের ভর m1m2 এবং মধ্যবর্তী দূরত্ব r , তারা পরস্পরকে একটি বল দ্বারা আকর্ষণ করে যার মান:

F=Gm1m2r2

তৃতীয় সূত্রের প্রয়োগ:

ভেক্টর রূপে লিখলে,

F12=F21

এটি নিউটনের তৃতীয় সূত্রের হুবহু প্রতিফলন। উপরের আপেলের উদাহরণ থেকে মিলিয়ে নাও।

কুলম্বের সূত্র (Coulomb's Law):

দুটি বিন্দু চার্জ, যাদের আধান q1q2 এবং মধ্যবর্তী দূরত্ব r , তাদের মধ্যে ক্রিয়াশীল স্থিরবৈদ্যুতিক বলের মানঃ

F=k|q1q2|r2

তৃতীয় সূত্রের প্রয়োগ:

ভেক্টর রূপে লিখলে,

F12=F21

সুতরাং, কুলম্বের সূত্রও নিউটনের তৃতীয় সূত্রের একটি নিখুঁত উদাহরণ। দুটি প্রোটন একে অপরকে যে বলে বিকর্ষণ করে, তাদের মধ্যে বলের মান সমান এবং দিক বিপরীত, যা তৃতীয় সূত্রকে সমর্থন করে।

Powered by Forestry.md