প্রসঙ্গ কাঠামো, গতি, আপেক্ষিক গতি
প্রসঙ্গ কাঠামো (Frame of Reference)
মনে করো, তুমি বাসে বসে আছো। তোমার পাশে আরেকজন যাত্রী বসে আছে। তোমার কাছে মনে হবে, পাশের যাত্রীটা স্থির, মানে এক জায়গাতেই বসে আছে। কিন্তু বাইরে রাস্তায় দাঁড়ানো কারো কাছে মনে হবে, তুমি আর ওই যাত্রী দুজনেই বাসের সাথে সাথে চলছ।
এই যে তুমি বাসের ভেতর থেকে বা বাইরের রাস্তা থেকে কোনো কিছুর অবস্থান বা গতি মাপছ, এই মাপার জন্য যে একটা স্থির জায়গা বা সিস্টেম কল্পনা করে নিচ্ছ, সেটাই হলো প্রসঙ্গ কাঠামো।
সহজ কথায়, যার সাপেক্ষে আমরা কোনো বস্তুর অবস্থান, স্থিতি বা গতি নির্ণয় করি, তাকেই প্রসঙ্গ কাঠামো বলে। এটা অনেকটা খেলার মাঠের মতো। কোন খেলোয়াড় কোথায় আছে, সেটা আমরা মাঠের সাপেক্ষে বলি।
প্রকারভেদ:
প্রসঙ্গ কাঠামোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়:
১. জড় প্রসঙ্গ কাঠামো (Inertial Frame of Reference)
২. অজড় প্রসঙ্গ কাঠামো (Non-inertial Frame of Reference)
১. জড় প্রসঙ্গ কাঠামো:
এটা হলো সেই সব "শান্তশিষ্ট" কাঠামো যারা হয় স্থির আছে, না হলে একদম একই গতিতে সরল রেখায় চলছে। মানে, এদের কোনো ত্বরণ (
- উদাহরণ: মনে করো, একটা ট্রেন একদম স্মুথভাবে (
) বেগে সোজা চলছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে ট্রেনের কোনো ঝাঁকুনি নেই। এই ট্রেনটা হলো একটা জড় প্রসঙ্গ কাঠামো। এর ভেতরে তুমি যদি একটা বল উপরে ছুড়ে দাও, দেখবে সেটা সোজাসুজি তোমার হাতেই এসে পড়ছে, কারণ এখানে নিউটনের প্রথম সূত্র (জড়তার সূত্র) কাজ করছে।
২. অজড় প্রসঙ্গ কাঠামো:
এই কাঠামো গুলো একটু "দুষ্টু" টাইপের। এরা স্থির থাকে না বা সমবেগে চলে না। এদের ত্বরণ থাকে। মানে, এদের বেগ সময়ের সাথে সাথে বদলায়। নিউটনের সূত্রগুলো এই কাঠামোতে সরাসরি খাটানো যায় না, একটু পরিবর্তন করে নিতে হয়।
- উদাহরণ: ওই একই ট্রেন যদি হঠাৎ ব্রেক কষে থেমে যায় বা হঠাৎ চলতে শুরু করে, তখন তুমি দেখবে যে তুমি সামনের দিকে বা পেছনের দিকে ঝুঁকে পড়ছ। কারণ, তখন ট্রেনটার একটা ত্বরণ বা মন্দন তৈরি হয়েছে। এই ত্বরণযুক্ত ট্রেনটাই হলো একটা অজড় প্রসঙ্গ কাঠামো। নাগরদোলায় ঘোরার সময় বাইরের দিকে ছিটকে যাওয়ার অনুভূতিও এই অজড় প্রসঙ্গ কাঠামোর কারণেই হয়।
মাত্রা (Dimension) অনুযায়ী প্রসঙ্গ কাঠামোর প্রকারভেদ:
আমরা কয়টা অক্ষ ব্যবহার করে কোনো বস্তুর অবস্থান বোঝাচ্ছি, তার ওপর ভিত্তি করে প্রসঙ্গ কাঠামোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়:
-
একমাত্রিক (1D): যখন কোনো বস্তু শুধু একটা সরল রেখা বরাবর চলে, তখন তার অবস্থান বোঝানোর জন্য শুধু একটা অক্ষ (
-অক্ষ) হলেই চলে। - উদাহরণ: একটা সোজা রাস্তায় গাড়ির চলা বা সুতার ওপর পিঁপড়ার হাঁটা।
-
দ্বিমাত্রিক (2D): যখন কোনো বস্তু একটা সমতলে (যেমন: মেঝে বা দেয়াল) চলে, তখন তার অবস্থান বোঝানোর জন্য দুটি অক্ষ (
এবং -অক্ষ) লাগে। - উদাহরণ: ক্যারম বোর্ডের গুটির চাল, মাঠে ফুটবল খেলা বা কাগজের ওপর কোনো পোকার হাঁটা।
-
ত্রিমাত্রিক (3D): যখন কোনো বস্তু শূন্যে বা খোলা জায়গায় চলাচল করে, তখন তার অবস্থান বোঝানোর জন্য তিনটি অক্ষ (
, এবং -অক্ষ) দরকার হয়। - উদাহরণ: আকাশে উড়ন্ত পাখি বা ঘুড়ি, কিংবা ঘরের মধ্যে উড়ে বেড়ানো মশা।
পরম গতি ও পরম স্থিতি (Absolute Motion and Absolute Rest)
পরম স্থিতি: মহাবিশ্বের সবকিছুই ঘুরছে—গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি। তাই, এমন কোনো বিন্দু খুঁজে পাওয়া অসম্ভব যা স্থির আছে। যদি এমন কোনো স্থির বিন্দু পাওয়া যেত, যার সাপেক্ষে অন্য সব বস্তুর স্থিতি মাপা যেত, তবে তাকে বলা হতো পরম স্থিতি। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই।
পরম গতি: যেহেতু পরম স্থির কোনো বস্তু নেই, তাই পরম গতিও মাপা সম্ভব না। পরম স্থির কোনো বস্তুর সাপেক্ষে কোনো বস্তুর গতিকে পরম গতি বলা হতো।
তাহলে আমরা যা কিছু মাপি, সবই আসলে আপেক্ষিক। আমাদের পৃথিবী ঘুরছে, সূর্যও তার গ্যালাক্সির চারপাশে ঘুরছে। তাই পৃথিবীতে বসে আমরা যা কিছু স্থির দেখি (যেমন: ঘর, গাছ), তা আসলে স্থির নয়।
আপেক্ষিক গতি (Relative Motion)
এই মহাবিশ্বে কোনো গতিই পরম নয়, সবই আপেক্ষিক। আপেক্ষিক গতি মানে হলো, একটা বস্তুর সাপেক্ষে আরেকটা বস্তুর গতির পরিমাপ।
-
সহজ উদাহরণ: তুমি আর তোমার বন্ধু দুটো আলাদা গাড়িতে করে একই দিকে যাচ্ছ। তোমার গাড়ির বেগ
আর তোমার বন্ধুর গাড়ির বেগ । তোমার কাছে মনে হবে, তোমার বন্ধুর গাড়িটা বেগে পেছনে চলে যাচ্ছে। আবার তোমার বন্ধুর কাছে মনে হবে, তুমি বেগে সামনে এগিয়ে যাচ্ছ। এটাই হলো আপেক্ষিক গতি। -
বিপরীত দিকের উদাহরণ: যদি তোমরা দুজন বিপরীত দিক থেকে আসতে থাকো, তখন কী হবে? মনে করো, তোমার গাড়ির বেগ
আর বন্ধুর গাড়ির বেগ । তখন তোমার কাছে মনে হবে বন্ধুর গাড়িটা বেগে তোমার দিকে ছুটে আসছে।
গাণিতিক উদাহরণ:
ধরা যাক, বৃষ্টির ফোঁটা খাড়া নিচের দিকে পড়ছে। বৃষ্টির বেগ
কারণ, এখানে তুমি বৃষ্টির আপেক্ষিক বেগ দেখছ।
- বৃষ্টির বেগ (নিচের দিকে),
- তোমার বেগ (অনুভূমিক দিকে),
তোমার সাপেক্ষে বৃষ্টির আপেক্ষিক বেগ,
ভেক্টর বিয়োগ করলে দেখা যাবে, আপেক্ষিক বেগের একটা অনুভূমিক উপাংশ (
Example
মনে করো, বৃষ্টি খাড়াভাবে
আর ছাতা ধরতে হবে
অর্থাৎ, উলম্বের সাথে প্রায়